মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে আব্বার নির্দেশেই মুক্তিযুদ্ধে যাই:বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আজাদ
01/01/1970 12:00:00শেখ আহসানুল করিম
বাগেরহাটের বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আজাদ দশম শ্রেনীর ছাত্র অবস্থায় রেডিওতে মেজর জিয়ার স্বাধীনতা ও মহান মুত্তিযুদ্ধ শুরুর ঘোষনা শুনে তার বাবার আমাকে নির্দেশ দেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ৩০ মার্চ আব্বা, মা ও ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাগেরহাট সদরের চিরুলিয়া স্কুলে কিংবদন্তি মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম খোকনের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে হাজির হন। যে বাবার নির্দেশে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন, দেশ স্বাধীনের পর বাড়ীতে ফিরে জানলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৭ অক্টোবর সকালে বাগেরগাট সদরের বারুইপাড়া গ্রামের তাদেও বাড়ীতে রাজাকাররা এসে বাবা আফসার উদ্দিন আহম্মদকে গুলি করে হত্যা করে। আগুন দিয়ে বাড়ীঘর পুড়িয়ে দেয়। বাবা দেশের স্বাধীনতা দেখে যেতে না পারার বেদনা এখনো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় শহীদের সন্তান এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে প্রথমে রফিক বাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যার তুলনায় আগ্নেয়াস্ত্র অনেক কম থাকায় সুযোগ হচ্ছিলনা সহযোদ্ধাদের সাথে আকবর আজাদের সরাসরি রণাঙ্গনে পাকিস্তান বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার।
এই অবস্থায় তিনি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে শত্রæর মুখোমুখি যুদ্ধ করে দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার প্রত্যয়ে নিয়ে কয়েকজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে মে মাসের মাঝামাঝি মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পৌছান। সেখান থেকে বীরভূম জেলার নুরপুরে ট্রেনিং ক্যাম্পে একমাস কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে সাতক্ষীরর শ্যামনগরের ইছামতি নদীর ওপারে ভারতের বেগুনদিয়া রেস্টক্যাম্পে আনা হয় তাদের। সহযোদ্ধাদের সাথে ৯ নম্বন সেক্টরের সুন্দরবন সাব সেক্টরে ঢুকতে ভারতের বেগুনদিয়ার এই ক্যাম্পে অবস্থান কালেই জুন মাসের শেষ সপ্তাহে এক রাতে তাদের পাকিস্তান বাহিনীর এ্যাম্বুশের মধ্যে পড়তে হয়। শত্রæ বাহিনী সদস্যরা রাতের আধারে ইছামতি নদী সাতরে পার হয়ে সীমান্তের ওপাওে পশ্চিমবঙ্গের বেগুনদিয়া রেস্টক্যাম্পে তিন পার্শের কয়েক শত স্থল মাইন স্থাপন করতে থাকে।
ভোরে সাতক্ষীরার শ্যামনগর পাড় থেকে শত্রু বাহিনী আমাদের ক্যাম্প লক্ষ করে মর্টার দিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, এসময়ে আমরা পিছু হটে ধান ক্ষেতে আশ্রয়ে নিলে মাইন স্থাপনকারি শত্রæ বাহিনীর উপস্থিতি টের পাই। তাদের ৯জনকে আটক করা হয়। তখন যদি ক্যাম্পের ডান-বাম বা সামনে দিয়ে বের হতাম তবে মাইন বিস্ফোরনে আমাদের অনেকেরই ছিল নিশ্চিত মৃত্যু। এরপর ভারতীয় বাহিনীর মাইন অপসারণ ইউনিটের সদস্যরা এসে ক্যাম্পের তিন দিকে পুতে রাখা শতাধিক মাইন অপসারণ করে নিয়ে যায়।
এভাবে প্রথম মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে জুলাই মাসের প্রথমার্ধে দুর্গম সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে বাগেরহাটের শরণখোলার বগি ক্যাম্পে পৌছাই। আমি সুন্দরবন সাব সেক্টরের সেকেন্ড ইন কমান্ডার প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক বিএনপি নেতা শামসুল আলম তালুকদারের নেতৃত্বে ৬ মাস একাধিক রণাঙ্গনে সরাসরি শত্রæ বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করি। এরমধ্যে স্মরণীয় যুদ্ধ হচ্ছে ১৪ ডিসেম্বর থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলাকে শত্রæমুক্ত করা। পাচদিনব্যাপী মরণপন লড়াইটি কখনোই ভূলতে পারবোনা। শরণখোলা থানায় পাকিস্তান বাহিনী ও রাজাকার ক্যাম্প দখল করেতে ১৪ ডিসেম্বর সকালে প্রথম দিন যুদ্ধ করতে করতে আমার পাশেই শহীদ হন সহযোদ্ধা গুরুপদ, বিকালে শহীদ দুই সহযোদ্ধা টিপু সুতান ও আসাদুজ্জামান। রাতে শত্রæর গুলিতে শহীদ হন আরো এক সহযোদ্ধা আলাউদ্দিন।
এরপরের দিনের একই রণাঙ্গনে শহীদ হন আরোএক সহযোদ্ধা আলতাফ হোসেন। ১৮ ডিসেম্বর ভোরে শরণখোলা থানায় পাকিস্তান বাহিনী ও রাজাকার ক্যাম্প দখল করি আমরা। এখনো ওই যুদ্ধে শহীদ হওয়া সহযোদ্ধাদের কথা মনে পড়ে। শরণখোলা উপজেলা সদরের শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে শত্রæর গুলিতে শহীদ চার মুক্তিযোদ্ধার কবর জিয়ারত করি।
বাগেরহাট মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আজাদ বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদেন সহযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের সন্তান। তার কাছে প্রত্যাশা হচ্ছে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তিদের সকল ষড়যন্ত্র কঠোর হাতে দমন করেন। দেশের রাষ্ট্রক্ষতা যেন কখনোই স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে না যায় তার ব্যবস্থা করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক দেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি সব ধরনের মব সন্ত্রাস বন্ধ করেন এমন পরামর্শ দেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।
