নদী-দস্যু ও বন চ্যালেঞ্জে নতুন ওসির ‘অগ্নিযাত্রা’
01/01/1970 12:00:00মাসুদ রানা,মোংলা
দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল মোংলা সমুদ্রবন্দর ঘিরে নানা অপরাধ, দস্যুতা ও মাদক চক্রের মধ্যে নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন আতিকুর রহমান। সুন্দরবন বেষ্টিত এই অঞ্চলে জলপথ, সড়কপথ ও বনপথ—সব মিলিয়ে জটিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যেই দায়িত্ব শুরু করেছেন তিনি।
নতুন ওসির যোগদানকে সাধারণ রদবদল হিসেবে দেখছেন না স্থানীয়রা। আগের ওসির মাত্র চার মাসের মাথায় বদলি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহলে নানা আলোচনা চলছে। ফলে দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই তাকে বড় ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
বন্দরকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট বড় চ্যালেঞ্জ
বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পশুর নদী এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজকে কেন্দ্র করে সক্রিয় রয়েছে কয়েকটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ভুয়া লাইসেন্সধারী জলযান ও স্পিডবোট ব্যবহার করে মাঝনদীতে নোঙর করা জাহাজ থেকে যন্ত্রাংশ, প্যানেল বোর্ড ও জ্বালানি তেল চুরির ঘটনা ঘটছে। এছাড়া লাইটার ও কার্গো জাহাজ থেকেও নিয়মিত পণ্য চুরির অভিযোগ রয়েছে।
এই চক্রগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা এবং দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নতুন ওসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সুন্দরবনে দস্যুতার পুনরুত্থান
দীর্ঘ সময় শান্ত থাকার পর পূর্ব সুন্দরবনের কয়েকটি এলাকায় আবারও বনদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। জেলে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি ও বনজীবীদের ওপর হামলার ঘটনায় আতঙ্ক বাড়ছে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণী শিকার ও কাঠ পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় র্যাব, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান চালানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সুন্দরবনের দুর্গম এলাকায় আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা নতুন ওসির অন্যতম অগ্রাধিকার হতে পারে।
ভূমিদখল ও রাজনৈতিক প্রভাব
মোংলার সমতল এলাকায় মাছের ঘের ও জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘাতের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের জমি দখল ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এসব কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
এই দখলবাজি বন্ধ করে সাধারণ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা নতুন ওসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মাদক রুট হিসেবে মোংলা
সড়ক ও জলপথের পাশাপাশি সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল-নদী ব্যবহার করে মাদক পাচারের অভিযোগ রয়েছে। দুর্গম বনাঞ্চল দিয়ে বড় চালান ঢুকছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল। ফলে মোংলা ধীরে ধীরে মাদকের ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মাদক চক্রের গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং পাচারের রুট বন্ধ করাই নতুন ওসির অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
প্রত্যাশা মোংলাবাসীর
স্থানীয়দের আশা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে নতুন ওসি অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। বন্দর নিরাপত্তা, বনদস্যুতা, মাদক ও দখলবাজি নিয়ন্ত্রণে সফল হলে মোংলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা।
সব মিলিয়ে বহুমুখী অপরাধের চাপে থাকা মোংলা অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করা নতুন ওসির জন্য কঠিন হলেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাঁর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ।
