Logo
table-post
মোংলায় ৫ টাকার প্রশ্ন ১০ টাকা
01/01/1970 12:00:00

মোংলা প্রতিনিধি
মোংলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম প্রান্তিক মুল্যায়ন পরিক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে রমরমা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষক সমিতির নেতাদের বিরুদ্ধে। পার্শ্ববর্তী রামপাল উপজেলায় একই পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ব্যয় যেখানে গড়ে ৫ টাকা, সেখানে মোংলায় শিক্ষার্থীদের উপকরণ ফান্ড থেকে নেয়া হচ্ছে দ্বিগুণ অর্থাৎ ১০ টাকা। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা এবং শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দের যোগসাজশে এই ‘প্রশ্ন সিন্ডিকেট’ ও অন্যান্য কাজের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষক ও অভিভাবকদের। 


অনুসন্ধানে জানা যায়, মোংলা উপজেলার ৭১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এবারের প্রথম প্রান্তিক মুল্যায়ন পরীক্ষায় মোট ৬ হাজার ৭৭৭ জন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপানো ও আনুসঙ্গিক ব্যয়ের জন্য প্রতি শিক্ষার্থীর এক সেট প্রশ্নের জন্য নামমাত্র টাকা কর্তন করার কথা। কিন্তু মোংলায় শিক্ষার্থীর প্রতি সেট প্রশ্ন বাবদ ১০ টাকা করে মোট ৬৭ হাজার ৭৭০ টাকা আদায় করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আনুসাঙ্গীক সহ প্রতি সেট প্রশ্নের প্রকৃত খরচ ৫ টাকার বেশি নয়। সেই হিসেবে এই একটি পরীক্ষাতেই শিক্ষার্থীদের সরকারী আমানত থেকে বাড়তি প্রায় ৩৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও রয়েছে সরকারী অন্যান্য বরাদ্ধও। 


একই জেলা ও একই সিলেবাসে পরীক্ষা চললেও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে পার্শ্ববর্তী রামপাল উপজেলায়। সেখানে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। রামপালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্নপত্রের জন্য ৪ টাকা এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মাত্র ৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গড়ে এক সেট প্রশ্নের জন্য ৫ টাকার মধ্যেই প্রশ্ন কম্পোজিং, ভুল সংশোধন, যাতায়াত খরচ, প্রশ্ন বহনকারী ব্যাগ, প্যাকেজিং ও গণনা খরচসহ যাবতীয় আনুসঙ্গিক ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ মোংলায় একই কাজের জন্য দ্বিগুণ অর্থ আদায় নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।


অভিযোগ উঠেছে, এই অর্থ আদায়ের নেপথ্যে রয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পিন্টু রঞ্জন দাস, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ললোন কুমার মন্ডল, এবং স্থানীয় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোঃ ফারুক হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ সাইদুর রহমান। সাধারণ শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিযোগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে শিক্ষক সমিতির একটি প্রভাবশালী অংশ এই প্রশ্ন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। কোনো শিক্ষক প্রতিবাদ করলে তাকে নানাভাবে হয়রানি বা বদলির ভয় দেখানো হয় বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন।
এদিকে নামমাত্র মূল্যের প্রশ্নপত্র ১০ টাকা নেয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ অভিভাবকরা। তাদের মতে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিম্নবিত্ত পরিবারের। সেখানে শিক্ষার উপকরণ ফান্ড নিয়ে এমন বাণিজ্য অমানবিক। সচেতন মহল মনে করছেন, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তদারকি না থাকায় মোংলায় এমন অনিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।


এ বিষয়ে জানতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পিন্টু রঞ্জন দাস’র সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সদুত্তর মেলেনি। তবে ভুক্তভোগীরা এই প্রশ্ন বাণিজ্যের সুষ্ঠু তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
প্রশ্নপত্রের বাড়তি দাম আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে মোংলা উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ললোন কুমার মন্ডল বিষয়টিকে হালকাভাবে এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ছাপানো, যাতায়াত এবং আনুষঙ্গিক অনেক খরচ থাকে। শিক্ষক সমিতি এই বিষয়টি সমন্বয় করে, তাই দামের বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবে। তবে একই মানের প্রশ্ন রামপালে কীভাবে ৫ টাকায় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। তার এই দায়সারা বক্তব্যে খোদ শিক্ষকদের মাঝেই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।


মোংলা উপজেলার ৭১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এবারের পরীক্ষায় মোট ৬ হাজার ৭৭৭ জন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। রামপাল উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য প্রশ্ন ফি গড়ে ৫ টাকা (১ম-২য় ৪ টাকা, ৩য়-৫ম ৬ টাকা) নির্ধারণ করা হলেও মোংলায় তা এক লাফে ১০ টাকা করা হয়েছে। এই ৫ টাকার বাড়তি ব্যবধানে সিন্ডিকেটটি হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা।

মোংলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোঃ ফারুক হোসেন বলেন, এ টাকা কোন ছাত্র/ছাত্রীর কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে না। সরকারী ¯িøপ ফান্ড থেকে নেয়া হচ্ছে, আর শিক্ষা কর্মকর্তারাই এ ১০ টাকা নির্ধারণ করেছে আমাদের কোন সম্পৃক্ততা নাই। যা গত বছরগুলো পরিক্ষায়ও নেয়া হয়েছে। 


সচেতন নাগরিকদের মতে, মোংলার অনেক অভিভাবক দিনমজুর বা মৎস্যজীবী। তাদের জন্য এই বাড়তি ৫ টাকার হিসাবটাও অনেক বড়। রামপাল যদি ৫ টাকায় সব আনুষঙ্গিক খরচ সামলাতে পারে, তবে মোংলা কেন পারবে না? আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেখানে শিক্ষা অবৈতনিক হওয়া উচিত, সেখানে নামমাত্র ফির নাম করে বাড়তি টাকা নেওয়া আসলে শিক্ষা বাণিজ্য ছাড়া কিছুই না। এখানে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা এবং শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ মিলে এই বাড়তি টাকার একটি বড় অংশ নিজেদের পকেটে তুলছেন। অবিলম্বে এই অতিরিক্ত ফি আদায় বন্ধের দাবি জানিয়ে এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কারা রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। 
 

@bagerhat24.com