Logo
table-post
সুন্দরবনে আত্মসমর্পণে ছোট সুমন বাহিনী
01/01/1970 12:00:00

মাসুদ রানা, মোংলা
সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে আবারও বাজতে শুরু করেছে বন ও জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের সুর। দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর শান্ত থাকার পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে সুন্দরবনে যে নতুন করে দস্যুবৃত্তির কালো মেঘ জমেছিল, তা কাটাতে এবার তৎপর হয়েছে প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় সুন্দরবনের অন্যতম ত্রাস ‘ছোট সুমন বাহিনী’ অন্ধকার জগত ছেড়ে আলোর পথে ফিরে আসার চুড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এই আলোচিত আত্মসমর্পণের খবর উপকূলবাসীর মনে স্বস্তি আনলেও, দস্যুদের কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদের উৎস এবং বিগত দিনে আত্মসমর্পণকারীদের পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও সংশয়। \

তবে সুন্দরনবনে সাধারণ জেলেদের মুক্ত করে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিড়ে আসুক এমন প্রত্যাশা উপক’লবাসীর। ছোট সুমন ২০১৮ সালেও সুন্দরবনের দস্যুতা ছেড়ে র‌্যাবের হাতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিয়ে আত্মসমর্পন করেছিল।

বন বিভাগ, দস্যুদমন অভিযান সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়,  ২০১৮ সালে তৎকালীন সরকারের উদ্যোগে সুন্দরবনের ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন জলদস্যু বিপুল পরিমান অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করার পর সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাময়িক স্থবিরতার সুযোগ নিয়ে সুন্দরবনে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে দস্যুবৃত্তি। বর্তমানে সুন্দরবনের বিভিন্ন জোনে ৮ থেকে ৯টি নতুন ও পুনর্গঠিত দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রতিটি বাহিনীর নেতৃত্বে বা সক্রিয় সদস্য হিসেবে রয়েছে ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ করা পুরোনো বন ও জলদস্যুদের একটি বড় অংশ। সাধারণ ক্ষমা পেয়ে আলোর পথে আসার নাটক করলেও, তারা গোপনে নিজেদের অপরাধের নেটওয়ার্ক বজায় রেখেছিল, যার প্রতিফলন ঘটছে বর্তমানের সুন্দরবনে।

বর্তমান দস্যু বাহিনীগুলোর কাছে রয়েছে একে-৪৭, থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, একনালা বন্দুক, পিস্তল এবং দেশীয় তৈরি পাইপগানসহ বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ বলে বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে। এই অস্ত্র নিয়ে তারা পুরো সুন্দরবন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সাগরে ও সুন্দরবনের খালে কাঁকড়া এবং মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা অসহায় জেলে-মৌয়ালদের অপহরণ করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। দস্যুরা জনপ্রতি মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় ও দাবি করছে। চাহিদা মতো টাকা না পেলে জেলে বহরে চালানো হচ্ছে সশস্ত্র হামলা, লুটপাট ও অপহরণ। এমনকি জেলেদের গহীন বনে আটকে রেখে চালানো হচ্ছে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন। এর ফলে উপক’লীয় অঞ্চলের মৎস্যজীবী পরিবারগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই জীবন বাঁচাতে সুন্দরবনে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন, যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতিতে।


সুন্দরবনকে পুনরায় দস্যুমুক্ত করতে কোস্ট গার্ড, র‌্যাব, পুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। নিয়মিত এই অভিযানে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন দস্যু আটক হয়েছে এবং উদ্ধার হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও তাজা গুলি। যৌথ বাহিনীর এই তীব্র চাপের মুখে পড়েই মূলত ‘ছোট সুমন বাহিনী’র সদস্যরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে এবং আইনি জটিলতা থেকে বাঁচতে সুমন বাহিনীর প্রধান ছোট সুমন ও তার সদস্যরা অন্ধকার জগত থেকে আলোর জগতে আসার পথ খুঁজছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ৩টি অস্ত্র ও কয়েক রাইন্ড গোলাবারুদ প্রশাসনের কাছে জমা দিয়ে এই বাহিনীর সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে। উপকূলবাসীও দস্যুতার অবসান চায়, তাই সুমনের এই আলোর পথে ফিরে আসার সিদ্ধান্তকে তারা স্বাগত জানাচ্ছে।

সুন্দরবন জুড়ে অন্ধকারের নেপথ্য নায়ক ও অস্ত্রের রহস্যসুমনের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিবাচক সাড়া থাকলেও, নেপথ্যের কিছু বাস্তব চিত্র সাধারণ মানুষের মনে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে, তারা বলছে, অস্ত্রের আসল হিসাব মিলবে তো? দস্যুদের কাছে থাকা বিপুল ও অত্যাধুনিক অস্ত্রের সবটুকুই কি জমা পড়বে, নাকি নামমাত্র কিছু ভাঙাচোরা অস্ত্র জমা দিয়ে বড় অংশটি গহীন বনে লুকিয়ে রাখা হবে এটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


স্থানীয়দের অভিযোগ, সুমনের প্ররোচনায় পড়ে সুন্দরবন সংলগ্ন অনেক তরুণ ও যুবক দস্যুবৃত্তিতে জড়িয়ে জীবন হারিয়েছে। অনেকে এখনো ডাকাতি ও অস্ত্র মামলায় বছরের পর বছর জেল খাটছে। অথচ সুমন নিজে আত্মসমর্পণ করে 'ভালো মানুষ' সেজে পার পেয়ে গেলেও, তার হয়ে মাঠ পর্যায়ে অপরাধ করা সাধারণ সদস্যরা বা তার চক্রান্তের শিকার পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে।

২০১৮ সালের সাধারণ ক্ষমার অপব্যবহার যেভাবে হয়েছে, এবারও সুমনের আত্মসমর্পণের পর তার পেছনের গডফাদার বা সাহায্যকারীরা পুনরায় নতুন কোনো বাহিনী তৈরি করবে না তার গ্যারান্টি কী, তা নিয়ে উপকূলীয় সাধারণ জনমনে রয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও শঙ্কা,তারা ভুগছে পুনরাবৃত্তির আশঙ্কায়।


সুন্দরবনের প্রান্তিকত জেলে এবং উপকূলীয় সচেতন মহলের দাবি, আত্মসমর্পণ যেন কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা বা আইনি সাজা এড়ানোর ঢাল না হয়। সুমন বাহিনীর প্রতিটি অস্ত্রের নিখুঁত হিসাব নেয়া এবং তাদের অর্থের যোগানদাতা ও নেপথ্যের গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা হয়। আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের কঠোর নজরদারিতে রাখার পাশাপাশি সুন্দরবনের জেলেদের জানমালের স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথ বাহিনীর এই অভিযান অব্যাহত রাখার জোর দাবি জানিয়েছে সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলবাসী।

এব্যাপারে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের গোয়েন্দা শাখা জানায়, সুমন সহ তার ৫ সহযোগী অস্ত্র ও গোলাবারুদ সহ আত্মসমর্পন করবে এমন প্রস্তুতি চলছে, তবে এখন পর্যন্ত কোন আনুষ্ঠানিকতা হয়নি, আইনিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে আত্মসমর্পনের আনুষ্ঠানিকতা সনম্পন্ন করা হবে। 

@bagerhat24.com