Logo
table-post
তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ, ৫ বছর পর খুলছে করমজল প্রজনন কেন্দ্র
01/01/1970 12:00:00

মাসুদ রানা,মোংলা 
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র, বন্য প্রাণী ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন সুরক্ষায় আজ ১ জুন থেকে টানা তিন মাস সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বন বিভাগ। ১ জুন থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলে জানায় চাদপাই রেঞ্জ ও পুর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় কর্মকর্তা। এ সময় জেলে, বাওয়াল, মৌয়াল, গোলপাতা সংগ্রহকারী থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশী পর্যটক-কেউই সুন্দরবনের ভেতরে ঢুকতে পারবেন না। বনের মৎস্য সম্পদ ও বন্যপ্রানী প্রজনন নিভিগ্ন করতে জেলে, বাওয়ালী, মৌয়াল ও পর্যটক সহ সকল ধরনের লোকজন এই তিন মাসের জন্য প্রবেশ বন্ধ ঘোষ করে সরকার ২০২০ সাল থেকে। সেই থেকে দীর্ঘ ৫ বছর পর এবছর থেকে শুধুমাত্র করমজল বন্যপ্রানী প্রজনন কেন্দ্র উম্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বন বিভাগের পক্ষ থেকে। 


বন বিভাগের মতে, জুন, জুলাই ও আগস্ট-এই তিন মাস মাস সুন্দরবনের অধিকাংশ মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, সরীসৃপ, পাখি ও স্থন্যপায়ী প্রাণীর প্রজননকাল। এ সময় বনে মানুষের প্রবেশ সীমিত করা না হলে মাছ, বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দীর্ঘ মেয়াদে সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য এ নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


বন বিভাগ জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে কোনো ধরনের পাস-পারমিট ইস্যু করা হবে না। কেউ অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করলে বন আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ টহল ও নজরদারি জোরদার করা হবে।


খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, জুন, জুলাই ও আগস্ট মাস সুন্দরবনের অধিকাংশ মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, সরীসৃপ, পাখি ও স্থন্যপায়ী প্রাণীর প্রজননকাল। এ সময়ে বনাঞ্চলের নদী-খালগুলো নানা প্রজাতির মাছের ডিম ছাড়ার নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের বিভিন্ন উদ্ভিদের বীজ অঙ্কুরোদ্গম ও নতুন চারা জন্মানোর জন্যও সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০ সাল থেকে প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনকে মানুষের সব ধরনের হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বন বিভাগ। 


বন সংরক্ষক আরো বলেন, বনজীবীদের নৌযান চলাচল, মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, পর্যটকবাহী ট্রলারের শব্দ এবং মানুষের উপস্থিতির কারণে বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও প্রজননপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে তিন মাস সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশে রাখা গেলে প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।


সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রানী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, গত ২০২০ সাল থেকে ৩ মাসের জন্য সুন্দরবনে সকল ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে বন বিভাগ। তবে দীর্ঘ ৫ বছর পর এবার শুধু মাত্র করমজল বন্যপ্রানী প্রজনন কেন্দ্র উম্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। করমজল পশুর নদীর পাড়ে হওয়ার মৎস্য, বন্যপ্রানী বা বনাঞ্চলের তেমন কোন ক্ষতি হবে না বলে এমন সিদ্দান্ত নেয়া হয়েছে। 


পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণের জন্য এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও সুন্দরবন-নির্ভর হাজারো পরিবারের মধ্যে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। আয়-রোজগারের প্রধান উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগামী তিন মাস কীভাবে সংসার চলবে, তা নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় রয়েছেন বনজীবীরা।


বনজীবীদের দাবি, জীববৈচিত্র সংরক্ষণ প্রয়োজন হলেও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘ তিন মাস বন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত তাদের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করে। তিন মাস বন বন্ধ থাকায় আয়-রোজগারের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অনেককে ঋণ করে সংসার চালাতে হয় এবং মহাজনসহ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ধারদেনায় জড়িয়ে পড়তে হয়।


নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় তারা চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েন। এ সময় খাদ্য সহায়তা ও বিশেষ প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন কর্মহীন বনজীবীরা।
বন বিভাগের নিষেধাজ্ঞা ‘ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ’ থাকে উল্লেখ করে সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল একাধিক বনজীবী বলেন, নিষেধাজ্ঞার মাঝেই অল্প সময়ে বেশি মাছ পেতে স্থানীয় কয়েকটি প্রভাবশালী চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় সুন্দরবনের অভয়ারণ্যের নদী-খালে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার করেন একশ্রেণীর জেলেরা। যে কারণে সুন্দরবনে প্রবেশে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয় কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা-প্রহরীদের ঘুস-বাণিজ্যে সেই কাজে সফলতা খুবই কম। এছাড়া, এসময় মাছের ডিম ছারার মৌসুম এবং মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির জন্য এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্ত বর্তমানে বন সংলগ্ন ও বনের ভিতরের নদী ও খালে নির্বিচারে অবৈধ নেটজাল দিয়ে মাছের পোনা নিধন করা হচ্ছে। সে ব্যাপারে কোন উদ্দোগ নেই প্রশাসন থেকে শুরু করে কারই। আর বর্তমানের এ কার্যক্রম চলছে খোদ কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ ও বন বিভাগের সামনেই।  


সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক শুভ্র শচীন জানান, সুন্দরবন উপকূলীয় প্রান্তিক মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস সুন্দরবন। তবে গত এক দশকে সুন্দরবনের অর্থনীতির গতিপথ অনেকটাই বদলে গেছে, তাতে ভুক্তভোগী হচ্ছে বনজীবীরা। তিনি আরো বলেন, সম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ নানা কারণে বনজসম্পদ আহরণসহ নানা উপায়ে বননির্ভরশীল মানুষের আয় কমেছে। মাছ-কাঁকড়া, মধু আহরণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।


তাছাড়া বন সুরক্ষায় স্থানীয় ও বনজীবীদের কার্যকর সম্পৃক্ততাও নিশ্চিত হয়নি। যে কারণে জীবীকার তাগিদে বনজসম্পদ আহরণে তাদের কেউ কেউ অবৈধ ও অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করেন। তবে সরকারি সহযোগিতা পেলে অপরাধ প্রবণতার পাশাপাশি বননির্ভরতা কমবেও। বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষদের বিকল্প কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সুন্দরবনে ‘প্রবেশনিষিদ্ধ’ সময়ে সরকারিভাবে খাদ্যসহায়তার ব্যবস্থা করতে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।


বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জলভাগ প্রায় ৩১ শতাংশ। এখানে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি ও ১৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী আছে।


গোটা সুন্দরবনের ওপর প্রায় দেড় লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল। প্রতি বছর ১২ হাজারের বেশি ‘জেলেনৌকা’ সুন্দরবনে প্রবেশের বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) নিয়ে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যায়। এসব নৌকায় জেলেরা দলবদ্ধভাবে থাকেন। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে পাঁচ হাজার ৮০০ জন আর পশ্চিম বিভাগে ছয় হাজার ৩১০ জন তালিকাভুক্ত বনজীবী রয়েছেন। বছরে ২ লাখেরও বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেন বলে জানায় বন বিভাগ। 
 

 

@bagerhat24.com